এবার তাহলে অমরনাথ যাওয়ার গল্প। আগেই লিখেছি সেটা আশির দশকে।প্রথম চাকরি পেয়েছি। চার অঙ্কের মাইনে, তখনকার এশিয়ার সবচেয়ে ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি জেসপে।প্রথম পোস্টিং রোলিংস্টক ইঞ্জিনিয়ারইং ডিভিসনে। হেড অফিস নেতজি সুভাস বোস রোড এ। অফিস ছিলো (অতীত কাল, কারণ এখন সেখানে বাংলা সরকারের কিছু আর নির্বাচন কমিশনের আফিস।) নেতাজি সুভাষ রোডের থেকে হেঁটে ঢোকার জন্য আর পেছন দিকের দরজা ছিল স্ট্র্যন্ড রোড থেকে গাড়ি নিয়ে ঢোকার জন্য।আমি জয়েন করলাম হেড অফিসে ,যদিও আমি শিক্ষানবীশ থাকার সময় ওয়ার্ক শপেই ছিলাম। হেড অফিসের কেতাই আলাদা, ছাতে তিনটে ক্যান্টিন, এএকটা ক্লার্কদের আর দুটো অফিসার দের। একটা বড় অফিসার দের অপরটা আমাদের. কাঁটা চামচে দিয়ে খেতে হত।তিন কোর্সের লাঞ্চ, প্রথম প্রথমে সুপ স্যালাড,তারপর মেন কোর্স আর শেষে dessert. সকালে চা আর সিঙাড়া (3 পয়সা) বিকেলে চা। সেই কোম্পানির কথা আর কি বলব.
যাই হোক, প্রথমেই ঠিক করলাম অমরনাথ যাব।সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলো, যে কোন দিন পাহাড়ে যায়নি সে প্রথমেই যাবে অমরনাথ?
কেউ সঙ্গে যেতে রাজি হলনা, কি আর করা একাই যাব ভেবে টিকিট কাটতে যাচ্ছিলাম ফেয়ারলি তে । সিঁড়ি দিয়ে নামতে- নামতে মনে হল যে একবার মতিলাল কে বলে দেখলে হয়। তাই গেলাম ইন্ডিয়ান ব্যঙ্কের ব্রাবোর্ণ রোড ব্রাঞ্চে. মতিলাল আমার জার্মান ভাষা শিক্ষার সহপাঠী. গিয়ে দেখি সে একমনে ভাউচার দেখছে. আমি বললাম আমি অমরনাথ যাচ্ছি,যাবি নাকি? মাথা না তুলেই বলল, “ যাব”।আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম। চটকরে দুটো জম্মুর স্লিপার ক্লাসের টকিট কেটে নিলাম।
তারপরে শুরু হল যাবার জিনিস জোগাড় করা. কেউ বলল আবশ্যই ভাল রেনকোট নিয়ে যাবি,কেউ বলল ফেদার স্লিপিংব্যাগ,তো কেউ বলে সংগে ছাতু রাখিস ইমারজেন্সির জন্য। কেউ বললনা যে কত কেজি বইতে পারবি সেটা দেখতে।
কোথায় লিলুয়া আর বেলুড়ের মাঝে পুলিসের রেনকোট আর জুতো পাওয়া যায়, তো কোথায় ভরুকা ট্রাস্ট ফেদার স্লিপিং ব্যাগ আর রুক স্যাক ভাড়া দেয়।
সে সব যোগাড় যন্ত্র করে বেরবার দিন দেখা গেল কেজি পঁচিশের ব্যাগ হয়েছে। আমার তখন জোয়ান বয়স,ওই ব্যাগ নিয়েই রওনা দিলাম।
বেচারা মতিলাল তো ব্যগের ভারেই উলটে যায় আর কি।
জম্মু তাওয়াই ছাড়ত শিয়ালদহ থেকে, দুই রাত একদিন পরে পৌঁছালো জম্মু।ট্রেন থেকে নেমে বাস স্ট্যান্ড গেলাম,পহেলগাঁও এর বাসের খোঁজে। পরের দিনের বাসের টিকিট কিনে দেখলাম বাস স্ট্যান্ডই থাকার ঘর আছে।আমরা একটা ডবলবেড নিলাম . সেই বয়সে আর ঘরের ভাল মন্দ বিচার ছিল না। কিন্তু দেখলাম গোটাবড়িতে কেবল আমরা দুজন।
যাই হোক রাত টা কাটিয়ে আমরা বাসে চড়ে বসলাম পহেলগাঁও এর উদ্দেশ্যে. একটা কথা বলা হয়নি যে ছুটি কম থাকায় আমরা কেবল অমরনাথ গিয়েছিলাম, কাশ্মীর বা বৈষ্ণোদেবী নয়।
পহেলগাঁও গিয়ে উঠলাম একটা হোটেলে রাস্তার ধারেই,লিডারের ধারে নয়।কারন তখন তো কোন ধারনা ছিলনা বেড়াতে যাবার।যাই হোক বিকেলে বেরোলাম চন্দনবাড়ি কি করে যাওয়া যায় তাই জানতে। জানা গেল যে জিপ যায় কিন্তু রাস্তা খুব খারাপ,নাহলে হেঁটে। হেঁটে যাওয়াই ঠিক হল।আমরা এমন সময় বেরিয়েছি যাতে ছড়ি যাত্রার ভিড় ও কাটানো যায় আবার ছডি যাত্রাটা কি, সেটা ও দেখা যায়। মানে ছড়ি যখন ফিরবে আমরা তখন যাব।
খানিক রাস্তা ধরে হাঁটলাম, তখন লিডার যেত পাসে -পাসে।তারপর একটা যায়গায় গেলাম সেখানে সব যাত্রীরা ভিড় করেছে,আপেল বিক্রি হচ্ছে। একরকম আপেল দেখলাম ছোটো ছোট কিন্তু মিষ্টি মতিলাল খেলো।আমি তো "মা ফলেসুকদাচন" মানে ফল খাইনা।
দেখলাম বহু লোক ফিরছে আর সাধুরা(?) তাদের কাছ থেকে লাঠি গুলো প্রায় কেড়ে নিচ্ছে. ওগুলো ফেরত দিলে পয়সা পাবে তাই।আমরা ওখানেই রইলাম এমন সময় এক গেরুয়াধারী এসে তাকে চারটে আপেল কিনে দিতে বলল।বলল যে ওরা চারজন আছে
এসেছে কর্নাটক থেকে, এসে থেকেই সবার প্রবল জ্বর। ও একটু ভাল তাই বেরিয়েছে কিছু খাবার জোগাড় করতে। আমরা বললাম ঠিক আছে আমরা আপনাকে দু কিলো মতন ছোট আপেল কিনে দিচ্ছি।
সাধু বলে আমরা অত কি করব আমাদের চারটে হলেই হবে।আমরা তো অবাক ,এরাও সাধু? পরে আপেল কিনে দিয়ে তাদের ডেরায় গেলাম, গিয়ে দেখি বাকি তিনজন শয্যাশায়ী কয়েকটা প্যারাসিটামল কিনে দিয়ে চলে এলাম।
পরেরদিন সকাল বেলা আমরা ব্যাগ কাঁধে রওনা হলাম জয় বাবা অমরনাথ বলে . দেখি একজন যার দুটো পা ই নেই, একটা টায়ার কাটার উপর বসে দু হাতে দুটো কাঠের খড়মের মত নিয়ে চলেছে,জয় বাবা ভোলেনাথ বলে। আমি মনে মনে ভাবলাম এ কি করে যাবে, এর পক্ষে পিসু পার করা অসম্ভব।
চওড়া রাস্তা, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম চন্দনবাড়ি।প্রচুর লংগর খাওয়ার অভাব নেই।অনেক তাঁবু রয়েছে মাটিতে মোটা করে খড় বিছিয়ে রাখা একটাতে ঢুকে স্লিপং ব্যাগ বের করে শুয়ে পোড়লাম।সকাল হতেই লুচি হালুয়া লংগর থাকে খেয়ে রওনা দিলাম ব্যগ কাঁধে।চন্দনবাড়ির পরেই পিসু চডাই,ওরা বলে জার্মান কি লড়াই।মতিলাল দেখি একটা শান্তিনিকেতনের ব্যাগ ঘাড়ে চলেছে।আমি বললাম একিরে তোর রুক্স্যক কোথায়? ও বলল অসম্ভব আমার পক্ষে তাই কেবল গরম জামা আর একটা পাতলা প্লেস্টিকের ঢাকনা নিয়ে চলল।
ক্রমে ক্রমে আমরা পিসু চড়াই চড়তে লাগলাম, শুরু করেছি প্রায় সকাল সাতটায় ওপরে পৌছলাম প্রায় একটায়।পৌঁছেই একেবারে চিৎপটাং। সামনের পাহাড়টা মনেহয় যেন ফনা তুলে দাঁড়িয়ে। খানিক বিশ্রামের পর আবার চলা শুরু ।চলতে চলতে পথে একটা বাঁক নিতেই এক অবাক করা দৃশ্য। পথের অনেক নিচে যেন একটা বিশাল আকার সাপ,যার ফনাএকটা হ্রদ আর দেহ একটা নদী। বুঝালাম শেষনাগ পৌঁছে গেছি।
ওপর থেকে দেখা গেল লেকের ধারে কয়েকটি তাঁবু, খুব ছোট ছোট আর রংবাহারি। আমরা সকলের যেখানে ব্যাবস্থা হোয়েছে সেখানে গিয়ে
একটা টেন্ট নিলাম ভাড়া দিয়ে,কারন এই টেন্টগুলিতে দুটি করে ফোল্ডং কট রয়েছে আর লেপ কম্বল। অনেক বেলা হয়েছে, আমরা একটা লংগরে ডাল ভাত সব্জি খেয়ে তাঁবুতে গিয়ে এক ঘুম।
ঘুম যখন ভাঙলো ত্তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। আমি মতিলাল কে বললাম কিরে খেতে যাবিনা?মতিলাল লেপের থেকে একটু মুখ বার করে
বলল আমি আর যাবনা তুই খেয়ে আমারটা নিয়ে আয়। অগত্যা আমি একাই গেলাম সরদারজির দোকানে। সেখানে রুটি তরকারি খেয়ে মতিলালেরটা নিয়ে ফিরতি রাস্তা ধরলাম। কিন্তু একি সারি সারি তাঁবুর কোনটা আমাদের? মতিলাল, মতিলাল বলে চিৎকার করেও কোন সাড়া পেলামনা,প্রবল ঠান্ডা এক হাতে খাবার অন্যহাতে torch,আমি তো পুরো ভ্যবাচাকা খেয়ে গেলাম। যদি ভুল তাঁবুতে ঢুকে পড়ি তবে খুব খারাপ হবে।কোন রকমে একটা ঠিক করে ঢুকে পড়লাম দেখি ঠিক তাঁবুতেই ঢুকেছি, মতিলাল লেপের মধ্যে, বললাম কিরে একটা সাড়া দিবি তো। ও বলল ধুর বড় ঠান্ডা, ভাল্লাগেনা। এই হচ্ছে মতিলাল।
খাবার রেখে আমিও শুয়ে পডলাম।
পরের দিন সকাল হতেই বেরিয়ে পড়লাম পঞ্চতরনীর দিকে ।পথে পেরতে হবে মহাগুনাপাশ বা বায়ুযান এখানে প্রবল হাওয়া দেয় তাই এরকম নাম। পথে পড়বে মহাগুনার চড়াই। চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম মহাগুনার চড়াই পেরিয়ে পঞ্চতরনী। দুদিকে উঁচু আর মাঝে বিরাট সমতল ভুমি। মনে হয় কোনকালে বিরাট গ্লেসিয়ার ছিল বা নদ ছিল।এখন শুধু সমতল আর মাঝে মাঝে বয়ে চলেছে ক্ষীণ স্রোত। এই সমতল টা প্রায় দু কিলোমিটার। মাঝে মাঝে স্রোতের উপর ছোট কাঠের পুল। ওইসব পেরিয়ে আবার উঠতে হবে পঞ্চতরনী পারে। ওপারেই তাঁবু। ওখানে লঙ্গরে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কাল দর্শন তাই না খেয়ে যাব।
পরের দিন সক্কালবেলা বেরিয়ে পোড়লাম।পথে একজায়গায় বলতালের রাস্তা এসে মিশল। আমরা আর একটু এগোতেই একটা মোড় এল আর এল প্রথম আমরনাথ গুহার দর্শন।দেখে মনে হল একটা বিশাল পাথরের টুকরো পাহাড়ের গা থেকে খুলে পড়ে গিয়েছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রায় গুহার কাছে পৌঁছে গেলাম। পাস দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অমর গঙ্গা। সরু নদী দুপাসে কালো পাথরের গুঁড়ো। আমি ঠিক করলাম স্নান করে পূজো দেব। মতিলাল ঠান্ডায় চান করবেনা তাই আমি সব ছেড়ে গামছা পরে, গরমজামা সব কাল পাথরের গুঁড়ো র ওপর রেখে বেশকরে সরসের তেল মাখলাম।মেখে নামলাম নদীতে, মনে হল জলের নিচে কিছুই নেই,দিলাম এক ডুব,মনেহল সারাশরীর জমে গেল, কিন্তু তার পর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল। এবার জমা পরার পালা,যেইনা জামাকাপড় তুলেছি , দেখি নিচে ছিল মোজা,সেটা আর একটা দস্তানা এই দুটোই গুয়ে মাখামাখি. কি আর করা , তখুনি সে দুটোকে অমর গঙ্গার জলে বিসর্জন দিলাম।কেউ বোধহয় অপকর্ম টি করে গুঁড়ো পাথর দিয়ে চাপা দিয়ে গিয়েছিল। আর আমি তার ওপরেই, যাকগে. তারপর গেলাম গুহায়।অনেক কটা সিঁড়ি বেয়ে উঠে তারপর গুহা।আর গুহার মধ্যে অনেক গুলো শিবলিঙ্গ। প্রবল ভিড়, আমি কোন মতে আমার পুজোটা সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গে ঠেকালাম আর লোকের ধাক্কায় প্রায় ছোট লিংগটার ওপরে পড়ে গেলাম।
ওটা নাকি গনেশ।
এদিকে পেটেতো ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। গুহার নিচেই একটা লংগর, তাতে রুটি আর বাচ্চা ছেলের ইয়ের মতন একরকমের বেসন গোলা দিচ্ছিল তাই নিয়ে খেয়ে বাঁচলাম। এরপর আমাদের ফেরার পালা। পঞ্চতরনী অব্ধি বেশ এলাম রাত্রির টা ও কাটল ভালোই। তার পরের দিন মুহাগুনাস হয়ে আসতে হবে পাশের উপর এলো বৃষ্টি। আমিতো পুলিশের রেনকোট পরে নিলাম কিন্তু মতিলাল? সে তো নিয়ে গেছে একটা প্লাস্টিক ।সেই প্লাস্টিক মহাগুনাসের হাওয়ায় পত পত করে উড়তে লাগলো, কি করি? তখন বের করলাম আমার স্যক থেকে একটা দড়ি,মতিলালের প্লাস্টিক ভাল করে জড়িয়ে বাঁধলাম, তারপর দড়ির একটা খুঁট ধরে, আর অপর হাতে লাঠি ধরে হাঁটতে লাগলাম। এই ভাবে কোন রকমে মহাগুনাস পেরিয়ে আমরা এলাম শেষ নাগের টেন্টের কাছে।প্রথম যে সর্দারজীর তাঁবুর দোকান পেলাম সেটাতেই ঢুকে পড়লাম।
“এ বাঙালি লোগো কো বহুত ঠন্ড লাগী হোগী ইনহে কাংডি দে দো।"
এই কথা বলল সর্দার জী।আমরা পেলাম কাংড়ি।সেখানেই কাটিয়ে দিলাম রাত। পরেরদিন চন্দনবাড়ি যাবারপথে দেখি সেই দুইপাকাটা লোকটা পিসু পেরিয়ে চলেছে, তাই তো বলে তাঁর কৃপা হলে পঙ্গু লঙ্ঘিয়তে গিরিম।
মনেহল কই শিব ঠাকুর কে দখতে তো পেলামনা।রাতে ঘুমের মধ্যে কে যেন বলে গেল কাল যে মানুষের দেখবি মুন্ডু দেখতে পাচ্ছিসনা সেইই আমি। পরের সারাদিন ধরে দেখেও কাউকেই পেলামনা যার মুন্ড দেখতে পাছিনা। রাতে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি কই মুন্ডু তো দেখতে পাচ্ছিনা,মানে আমিই শিব।
মনে পড়ে গেল শংঙ্করাচার্যের নির্বাণষ্টকম্ এর কথা -
"ওঁ মনোবুদ্ধাহঙ্কারচিত্তানি নাহং
ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চ ঘ্রাণনেত্রে ।
ন চ ব্যোম ভূমির্ন তেজো ন বায়ু-
শ্চিদানন্দরূপঃ শিবোঽহং শিবোহহম্।।"