May 7, 2025

অমরনাথ বছর ৪৫ আগে

এবার তাহলে অমরনাথ যাওয়ার গল্প। আগেই লিখেছি সেটা আশির দশকে।প্রথম চাকরি পেয়েছি। চার অঙ্কের মাইনে, তখনকার এশিয়ার সবচেয়ে ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি জেসপে।প্রথম পোস্টিং রোলিংস্টক ইঞ্জিনিয়ারইং ডিভিসনে। হেড অফিস  নেতজি সুভাস বোস রোড এ।  অফিস ছিলো (অতীত কাল, কারণ  এখন সেখানে বাংলা সরকারের কিছু আর নির্বাচন কমিশনের আফিস।) নেতাজি সুভাষ রোডের থেকে হেঁটে ঢোকার জন্য  আর পেছন দিকের দরজা ছিল স্ট্র‍্যন্ড রোড থেকে গাড়ি নিয়ে ঢোকার জন্য।আমি জয়েন করলাম হেড অফিসে ,যদিও আমি শিক্ষানবীশ থাকার সময় ওয়ার্ক শপেই ছিলাম। হেড অফিসের কেতাই আলাদা, ছাতে তিনটে ক্যান্টিন, এএকটা ক্লার্কদের  আর দুটো অফিসার দের। একটা  বড় অফিসার দের অপরটা আমাদের. কাঁটা চামচে দিয়ে খেতে হত।তিন কোর্সের লাঞ্চ,  প্রথম প্রথমে সুপ স্যালাড,তারপর মেন কোর্স আর শেষে dessert. সকালে চা আর সিঙাড়া (3 পয়সা) বিকেলে চা। সেই কোম্পানির কথা আর কি বলব.
যাই হোক, প্রথমেই ঠিক করলাম  অমরনাথ যাব।সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলো, যে কোন দিন  পাহাড়ে যায়নি সে প্রথমেই যাবে অমরনাথ?
কেউ সঙ্গে যেতে রাজি হলনা, কি আর করা একাই যাব ভেবে টিকিট কাটতে যাচ্ছিলাম ফেয়ারলি তে । সিঁড়ি দিয়ে নামতে- নামতে মনে হল যে একবার মতিলাল কে বলে দেখলে হয়। তাই গেলাম ইন্ডিয়ান ব্যঙ্কের ব্রাবোর্ণ রোড ব্রাঞ্চে. মতিলাল আমার জার্মান ভাষা শিক্ষার সহপাঠী. গিয়ে দেখি সে  একমনে ভাউচার দেখছে. আমি বললাম আমি অমরনাথ যাচ্ছি,যাবি নাকি? মাথা না তুলেই বলল, “ যাব”।আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম। চটকরে দুটো জম্মুর স্লিপার ক্লাসের টকিট কেটে নিলাম।
তারপরে শুরু হল যাবার জিনিস জোগাড় করা. কেউ  বলল আবশ্যই ভাল রেনকোট নিয়ে যাবি,কেউ বলল ফেদার স্লিপিংব্যাগ,তো কেউ বলে সংগে ছাতু রাখিস ইমারজেন্সির জন্য। কেউ বললনা যে কত কেজি বইতে পারবি সেটা দেখতে।
কোথায় লিলুয়া আর বেলুড়ের মাঝে পুলিসের রেনকোট আর জুতো পাওয়া যায়, তো কোথায় ভরুকা ট্রাস্ট ফেদার স্লিপিং ব্যাগ আর রুক স্যাক  ভাড়া দেয়।

সে সব যোগাড় যন্ত্র  করে বেরবার দিন দেখা গেল কেজি পঁচিশের ব্যাগ হয়েছে। আমার তখন জোয়ান বয়স,ওই ব্যাগ নিয়েই রওনা দিলাম।
বেচারা মতিলাল তো ব্যগের ভারেই উলটে যায় আর কি।
জম্মু তাওয়াই ছাড়ত শিয়ালদহ থেকে, দুই রাত একদিন পরে পৌঁছালো জম্মু।ট্রেন থেকে নেমে বাস স্ট্যান্ড গেলাম,পহেলগাঁও এর বাসের খোঁজে। পরের দিনের বাসের টিকিট কিনে দেখলাম বাস স্ট্যান্ডই থাকার ঘর আছে।আমরা একটা ডবলবেড নিলাম . সেই বয়সে আর ঘরের ভাল মন্দ বিচার ছিল না। কিন্তু দেখলাম গোটাবড়িতে কেবল আমরা দুজন।
যাই হোক রাত টা কাটিয়ে আমরা বাসে চড়ে বসলাম পহেলগাঁও এর  উদ্দেশ্যে. একটা কথা বলা হয়নি যে ছুটি কম থাকায় আমরা কেবল  অমরনাথ গিয়েছিলাম, কাশ্মীর বা বৈষ্ণোদেবী নয়।

পহেলগাঁও গিয়ে উঠলাম একটা হোটেলে  রাস্তার ধারেই,লিডারের ধারে নয়।কারন তখন তো কোন ধারনা ছিলনা বেড়াতে যাবার।যাই হোক বিকেলে বেরোলাম চন্দনবাড়ি কি করে যাওয়া যায় তাই জানতে। জানা গেল যে জিপ যায় কিন্তু রাস্তা খুব খারাপ,নাহলে হেঁটে। হেঁটে যাওয়াই ঠিক হল।আমরা এমন সময় বেরিয়েছি যাতে ছড়ি যাত্রার ভিড় ও কাটানো যায় আবার ছডি যাত্রাটা কি, সেটা ও দেখা যায়। মানে ছড়ি যখন ফিরবে আমরা তখন যাব।
খানিক রাস্তা ধরে হাঁটলাম, তখন লিডার যেত পাসে -পাসে।তারপর একটা যায়গায় গেলাম সেখানে সব যাত্রীরা ভিড় করেছে,আপেল বিক্রি হচ্ছে। একরকম আপেল দেখলাম ছোটো ছোট কিন্তু মিষ্টি মতিলাল খেলো।আমি তো "মা ফলেসুকদাচন" মানে ফল খাইনা।
দেখলাম বহু লোক ফিরছে আর সাধুরা(?) তাদের কাছ থেকে লাঠি গুলো প্রায় কেড়ে নিচ্ছে. ওগুলো ফেরত দিলে পয়সা পাবে তাই।আমরা ওখানেই রইলাম এমন সময় এক গেরুয়াধারী এসে তাকে চারটে আপেল কিনে দিতে বলল।বলল যে ওরা চারজন আছে
এসেছে কর্নাটক থেকে, এসে থেকেই সবার প্রবল জ্বর। ও একটু ভাল তাই বেরিয়েছে কিছু খাবার জোগাড় করতে। আমরা বললাম ঠিক আছে আমরা আপনাকে দু কিলো মতন ছোট আপেল কিনে দিচ্ছি। 
সাধু বলে আমরা অত কি করব আমাদের চারটে হলেই হবে।আমরা তো অবাক ,এরাও সাধু? পরে আপেল কিনে দিয়ে তাদের ডেরায় গেলাম, গিয়ে দেখি বাকি তিনজন শয্যাশায়ী কয়েকটা প্যারাসিটামল কিনে দিয়ে চলে এলাম।
পরেরদিন সকাল বেলা আমরা ব্যাগ কাঁধে রওনা হলাম জয় বাবা অমরনাথ বলে . দেখি একজন যার দুটো পা ই নেই, একটা টায়ার কাটার উপর বসে দু হাতে দুটো কাঠের খড়মের মত নিয়ে চলেছে,জয় বাবা ভোলেনাথ বলে। আমি মনে মনে ভাবলাম এ কি করে যাবে, এর পক্ষে পিসু পার করা অসম্ভব।
চওড়া রাস্তা, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম চন্দনবাড়ি।প্রচুর লংগর খাওয়ার অভাব নেই।অনেক তাঁবু রয়েছে মাটিতে মোটা করে খড় বিছিয়ে রাখা একটাতে ঢুকে স্লিপং ব্যাগ বের করে শুয়ে পোড়লাম।সকাল হতেই লুচি হালুয়া লংগর থাকে খেয়ে রওনা দিলাম ব্যগ কাঁধে।চন্দনবাড়ির পরেই পিসু চডাই,ওরা বলে জার্মান কি লড়াই।মতিলাল দেখি একটা শান্তিনিকেতনের ব্যাগ ঘাড়ে চলেছে।আমি বললাম একিরে তোর রুক্স্যক কোথায়? ও বলল অসম্ভব আমার পক্ষে তাই কেবল গরম জামা আর একটা পাতলা প্লেস্টিকের ঢাকনা নিয়ে চলল।
ক্রমে ক্রমে আমরা পিসু চড়াই চড়তে লাগলাম, শুরু করেছি প্রায় সকাল সাতটায় ওপরে পৌছলাম প্রায় একটায়।পৌঁছেই একেবারে চিৎপটাং। সামনের পাহাড়টা মনেহয় যেন ফনা তুলে দাঁড়িয়ে। খানিক বিশ্রামের পর আবার চলা শুরু ।চলতে চলতে পথে একটা বাঁক নিতেই এক অবাক করা দৃশ্য। পথের অনেক নিচে যেন একটা বিশাল আকার সাপ,যার ফনাএকটা হ্রদ আর দেহ একটা নদী। বুঝালাম শেষনাগ পৌঁছে গেছি।
ওপর থেকে দেখা গেল লেকের ধারে কয়েকটি তাঁবু, খুব ছোট ছোট আর রংবাহারি। আমরা সকলের যেখানে ব্যাবস্থা হোয়েছে সেখানে গিয়ে 
একটা টেন্ট নিলাম ভাড়া দিয়ে,কারন এই টেন্টগুলিতে দুটি করে ফোল্ডং কট রয়েছে আর লেপ কম্বল। অনেক বেলা হয়েছে, আমরা একটা লংগরে ডাল ভাত সব্জি খেয়ে তাঁবুতে গিয়ে এক ঘুম।
ঘুম যখন ভাঙলো ত্তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। আমি মতিলাল কে বললাম কিরে খেতে যাবিনা?মতিলাল লেপের থেকে একটু মুখ বার করে 

বলল আমি আর যাবনা তুই খেয়ে আমারটা নিয়ে আয়। অগত্যা আমি একাই গেলাম সরদারজির দোকানে। সেখানে রুটি তরকারি খেয়ে মতিলালেরটা নিয়ে ফিরতি রাস্তা ধরলাম। কিন্তু একি সারি সারি তাঁবুর কোনটা আমাদের?  মতিলাল, মতিলাল বলে চিৎকার করেও কোন সাড়া পেলামনা,প্রবল ঠান্ডা এক হাতে খাবার অন্যহাতে torch,আমি তো পুরো ভ্যবাচাকা খেয়ে গেলাম। যদি ভুল তাঁবুতে ঢুকে পড়ি তবে খুব খারাপ হবে।কোন রকমে একটা ঠিক করে ঢুকে পড়লাম দেখি ঠিক তাঁবুতেই ঢুকেছি, মতিলাল লেপের মধ্যে, বললাম কিরে একটা সাড়া দিবি তো। ও বলল ধুর বড় ঠান্ডা, ভাল্লাগেনা। এই হচ্ছে মতিলাল।
খাবার রেখে আমিও শুয়ে পডলাম।
পরের দিন সকাল হতেই বেরিয়ে পড়লাম পঞ্চতরনীর দিকে ।পথে পেরতে হবে মহাগুনাপাশ বা বায়ুযান এখানে প্রবল হাওয়া দেয় তাই এরকম নাম। পথে পড়বে মহাগুনার চড়াই। চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম মহাগুনার চড়াই পেরিয়ে পঞ্চতরনী। দুদিকে উঁচু আর মাঝে বিরাট সমতল ভুমি। মনে হয় কোনকালে বিরাট গ্লেসিয়ার ছিল বা নদ ছিল।এখন শুধু সমতল  আর মাঝে মাঝে বয়ে চলেছে ক্ষীণ স্রোত। এই সমতল টা প্রায় দু কিলোমিটার। মাঝে মাঝে স্রোতের উপর ছোট কাঠের পুল। ওইসব পেরিয়ে আবার উঠতে হবে পঞ্চতরনী পারে। ওপারেই তাঁবু। ওখানে লঙ্গরে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কাল দর্শন তাই না খেয়ে যাব।
পরের দিন সক্কালবেলা বেরিয়ে পোড়লাম।পথে একজায়গায় বলতালের রাস্তা এসে মিশল। আমরা আর একটু এগোতেই একটা মোড় এল আর এল প্রথম আমরনাথ গুহার দর্শন।দেখে মনে হল একটা বিশাল পাথরের টুকরো  পাহাড়ের  গা থেকে খুলে পড়ে গিয়েছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রায় গুহার কাছে পৌঁছে গেলাম। পাস দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অমর গঙ্গা। সরু নদী দুপাসে কালো পাথরের গুঁড়ো। আমি ঠিক করলাম স্নান করে পূজো দেব। মতিলাল ঠান্ডায় চান করবেনা তাই আমি সব ছেড়ে গামছা পরে, গরমজামা সব কাল পাথরের গুঁড়ো র ওপর রেখে বেশকরে সরসের তেল মাখলাম।মেখে নামলাম নদীতে, মনে হল জলের নিচে কিছুই নেই,দিলাম এক ডুব,মনেহল সারাশরীর  জমে গেল, কিন্তু তার পর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল। এবার জমা পরার পালা,যেইনা জামাকাপড় তুলেছি , দেখি নিচে ছিল মোজা,সেটা আর একটা দস্তানা এই দুটোই গুয়ে মাখামাখি.  কি আর করা , তখুনি সে দুটোকে অমর গঙ্গার জলে বিসর্জন দিলাম।কেউ বোধহয় অপকর্ম টি করে গুঁড়ো পাথর দিয়ে চাপা দিয়ে গিয়েছিল। আর আমি তার ওপরেই, যাকগে.  তারপর গেলাম গুহায়।অনেক কটা সিঁড়ি বেয়ে উঠে তারপর গুহা।আর গুহার মধ্যে অনেক গুলো শিবলিঙ্গ। প্রবল ভিড়, আমি কোন মতে আমার পুজোটা সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গে ঠেকালাম আর লোকের ধাক্কায় প্রায় ছোট লিংগটার ওপরে পড়ে গেলাম।
ওটা নাকি গনেশ।
এদিকে পেটেতো ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। গুহার নিচেই একটা লংগর, তাতে রুটি আর বাচ্চা ছেলের ইয়ের মতন একরকমের বেসন গোলা দিচ্ছিল তাই নিয়ে খেয়ে বাঁচলাম। এরপর আমাদের ফেরার পালা। পঞ্চতরনী অব্ধি  বেশ এলাম রাত্রির টা ও কাটল ভালোই। তার পরের দিন মুহাগুনাস হয়ে আসতে হবে পাশের  উপর এলো বৃষ্টি। আমিতো পুলিশের রেনকোট পরে নিলাম কিন্তু মতিলাল?  সে তো নিয়ে গেছে একটা প্লাস্টিক ।সেই প্লাস্টিক মহাগুনাসের হাওয়ায় পত পত করে উড়তে লাগলো, কি করি?  তখন বের করলাম আমার স্যক থেকে একটা দড়ি,মতিলালের প্লাস্টিক ভাল করে জড়িয়ে বাঁধলাম, তারপর দড়ির একটা খুঁট ধরে, আর অপর হাতে লাঠি ধরে হাঁটতে লাগলাম। এই ভাবে কোন রকমে মহাগুনাস পেরিয়ে আমরা এলাম শেষ নাগের টেন্টের কাছে।প্রথম যে সর্দারজীর তাঁবুর দোকান পেলাম সেটাতেই ঢুকে পড়লাম।
“এ বাঙালি লোগো কো বহুত ঠন্ড লাগী হোগী ইনহে কাংডি দে দো।"
এই কথা বলল সর্দার জী।আমরা পেলাম কাংড়ি।সেখানেই কাটিয়ে দিলাম রাত। পরেরদিন চন্দনবাড়ি যাবারপথে দেখি সেই দুইপাকাটা লোকটা পিসু পেরিয়ে চলেছে, তাই তো বলে তাঁর কৃপা হলে পঙ্গু লঙ্ঘিয়তে গিরিম।
 মনেহল কই শিব ঠাকুর কে দখতে তো পেলামনা।রাতে ঘুমের মধ্যে কে যেন বলে গেল কাল যে মানুষের দেখবি মুন্ডু দেখতে পাচ্ছিসনা সেইই আমি। পরের সারাদিন ধরে দেখেও কাউকেই পেলামনা যার মুন্ড দেখতে পাছিনা। রাতে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি কই মুন্ডু তো দেখতে পাচ্ছিনা,মানে আমিই শিব।
মনে পড়ে গেল শংঙ্করাচার্যের  নির্বাণষ্টকম্ এর কথা -

"ওঁ মনোবুদ্ধাহঙ্কারচিত্তানি নাহং
ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চ ঘ্রাণনেত্রে ।
ন চ ব্যোম ভূমির্ন তেজো ন বায়ু-
শ্চিদানন্দরূপঃ শিবোঽহং শিবোহহম্।।"

Mar 17, 2025

আজব চশমা।

আজ আমার শেষ বারের কুম্ভ মেলা ভ্রমনের আর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলি।আমি আজ পর্যন্ত তিনবার কুম্ভমেলায় গেছি,তিন বারই এলাহাবাদে।প্রথম দুবার পুর্ণকুম্ভ আর তিনবারেরবার অর্ধকুম্ভ।প্রথম বার গিয়েছিলাম আমি সস্ত্রীক,  ছোট কাকা, কাকীমা। সেবার কোন থাকার যায়গা ঠিক না করেই। কপালগুণে গৌড়ীয় মঠে একটা ঘর মিলে গেল।আমরা গিয়েছিলাম একটা শাহী স্নানের আগের দিন।ঘরে ঢুকেই খবর নিতে লাগলাম পরের দিন স্নান কখন আর কি করে যাব। খবর শুনে বৌ আর কাকীমার মাথায় হাত।স্নান রাত প্রায় আড়াইতেতে বেরুতে হবে,স্নান তিনটে পনেরোয়। সামনেই ভারতসেবাশ্রম, ওখানেই
রাত দুটো নাগাদ লোকে জড় হবে, আড়াইটের সময় মহারাজের সাথে সঙ্গমে স্নানের জন্য রওনা হবে। শুনে গিন্নি ও কাকীমা বলল, " মাথায় থাক পুন্য, আমরা বাবা যাবনা" অতয়েব শীতের রাতে দুটোর সময় আমি আর ছোট কাকা গেলাম চান করতে। ফিরলাম ভোর হতে। সেদিনটা মেলা দেখে রাতে ট্রেন ধরলাম।
বার বছর পর পরের কুম্ভ মেলায় গিয়েছিলাম আমি আর ছোট কাকা। ছিলাম দ্বিবেদিজির কল্পবাসী বাবা মায়ের সাথে পাসের তাঁবুতে। দ্বিবেদিজি,  পন্ডিত ফ্যামিলির লোক, ওনারা প্রতিবছর গোটা মাস সঙ্গমে সাত্বিক স্বপাক ভোজন করেন, স্নান করেন,সঙ্গমে তাঁবুতে বাস করেন। আমরা দ্বিবেদিজর কৃপায় ওনার বাবামার পাসে একটা তাঁবু পেয়েছলাম, দিন দশেক ছিলাম।
গিয়েই ব্যাগ রেখে গেলাম সঙ্গমে চান করতে গেলাম  জামা কাপড় রেখে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ছোট কাকা চানকরে এলো আমি গেলাম চান করতে,ছোট কাকা প্যান্ট পরতে গিয়ে দেখে নেই।পকেটে ছিল টাকাপয়সা,মোবাইল সব। ছোট কাকা তো বলে ফিরে যাব,যাইহোক কোনো রকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে থাকতে রাজি করালাম।তারপর বেশকিছুদিন তাঁবু তে ছিলাম রোজ স্নান করলাম।
তার পর ফিরে এলাম।
  
তারপর আরো ছয় বছর পরে এলাহাবাদে অর্ধকুম্ভ। ইতিমদ্ধে  দ্বিবেদিজির মহাগুরুনিপাত হয়েছে। ওনাদের আর কেউ কল্পবাস করেনা।তবু দ্বিবেদিজি একটা ব্যাবস্থা করে দিলেন। এবার গেলাম আমি আর ভাস্কর। ভাস্কর আগে কুম্ভ মেলায় যায়নি। এবার তাঁবুটা সঙ্গম থেকে অনেক দূরে, ব্রিজের তলা দিয়ে বেশ খানিক গিয়ে। এবারের কুম্ভমেলা অনেক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এবার দিন সাতেক থাকব বলে গিয়েছিলাম।সাহীস্নানের দুদিন আগে গেছি আর পরে দুই দিন।আসা যাওয়া নিয়ে দিন সাতেক। প্রথম দিন অনেকটা হেঁটে স্নান করে এলাম। সন্ধ্যায় বিভিন্ন আখাড়ায় ঘুরে ঘুরে সৎসঙ্গ। সাহী স্নান সকাল ছটার মধ্যে। সঙ্গমে যেতে ঘন্টা খানেক তো লাগবেই। সাড়েপাঁচটায় স্নান করতে হলে সাড়েচারটেতে বেরতে হবে। মোবাইলে চারটেতে য়্যলার্ম দিয়ে শুলাম। মাটিতে খড় বিছান তার ওপরে তেরপল দেওয়া। তার ওপরে স্লিপিংব্যাগে আমরা। ভোর হতে আমরা রওয়ানা দিলাম। সঙ্গমে পৌছে ভালোকরে সরষের তেল মেখে আমি গেলাম চান করতে,  চশমা আর বাকি সব ভাস্করের কাছে রইল।
চান করতে নামব, চশমা নেই,তাই দুরের কিছু ঠিক মত দেখতে পাচ্ছিনা।পাসেই একজন দেহাতি টাইপের লোক দাঁড়িয়ে। পরনে খেঁটে ধুতি, ফর্সা চেহারা,লম্বা লম্বা চুল,বছর পঁইতিরিসবয়স, মুখটা একটু মেয়েলি, আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে,  কি রকম অস্বস্তি লাগতে লাগল।
"ক্য হুয়া, সাচ ঠিক ঠাহর নেহি হো রহা হ্যায়"
"হাঁ, চশমা নেহি হ্যায় না, ইস লিয়ে"
"এক কাম কিজিয়ে, ইয়ে চশমা পহন লিজিয়ে, সব ঠিক ঠিক দিখাই দেগা। ফিকর মাত কর,ইয়ে চশমা নস্ট নেহি হোগা।"
এই না বলে সে আমাকে একটা কাল চশমা,  অনেকটা ছানি অপারেশনের পরে যেরকম দেয়, দুম করে পরিয়ে দিল। ব্যাস কোথায় সঙ্গম,কোথায় এলাহাবাদ, কোথায় ভিড় সব মিলিয়ে গেল,দেখলাম মা,বাবা,দাদু,কাকারা,মাসী,মেশো যারা এই জগতে নেই তারা আর যারা বেঁচে তারাও সবাই আগে পরে একটা বিরাট কাল গর্তের দিকে ধাবমান, ক্রমশ তারা মিলিয়ে গেল, প্রিথিবী, চন্দ্র,গ্রহ তারা সেই গর্তের দিকে এগোতে লাগল, ক্রমশ গরুর গাড়ির চাকার মত আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি গর্তে মিলিয়ে গেল এর পর ক্রমশ একের পর এক গ্যেলাক্সি মিলিয়ে যেতে লাগল। চারপাশে তাকাতে চোখ ঝলসে গেল। যেন সত সুর্যের আলো। তার মধ্যে কত রকমের প্রানী, যাদের কখনো চোখে দেখিনি,এমনকি ডিস্কভারিতেও নয়। ইতি মধ্যে সব সমেত কাল গর্তের কাছে এসে গেছি, ভয় করতে লাগল।ফিরতে পারব তো? গর্তের মধ্যে যেই না ঢুকে গেছি, দেখি আলাদা কিছু নেই, আগুনের গোলার মত ঘুরছে, আর নতুন জগৎ জন্ম নিচ্ছে,আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠে চোখ থেকে কাল চশমাটা টেনে খুলে সামনে সঙ্গমের জলে ফেলে দিলাম। দেখি পাসে সেই দেহাতি লোকটা মিটি মিটি হাঁসছে, বলল "ক্যা হুয়া সাচ সহা নেহি গয়া? অত্রি গুহামে নিরপেক্ষ সাচ ভি নেহি ঔর ইধর সাপেক্ষ সাচ ভি নেহি?"
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং, ক্রিং....... এলার্ম বাজছে, ভাস্কর ডাকছে, কি হল! ওঠ শাহী স্নান করবি না?
য়্যঁ,.....  ও হ্যাঁ  ঠকই তো....  আমি উঠে পড়ি।গামছা, তেল সবই তো গোছান  আছে, চল, বলে আমরা বেরিয়ে পোড়ি।








Apr 3, 2024

মন

আজ একটা গল্প বলি, আমার শোনা লেখা নয়।একবার একজন লোক শুনলো যে ধ্যান করলে নাকি সব পাওয়া যায়, তাই সে ঠিক করল ধ্যান শিখবে।
কিন্ত কে শেখাবে? লোকে বলে তিব্বতি লামারা নাকি ভাল ধ্যান করতে জানে। লোকটা অনেক কষ্টে হিমালয় অতিক্রম করে তিব্বত পৌঁছে গেল। এক লামাকে দেখে সে বলল তাকে ধ্যান সেখাতে। লামাতো রাজি কিন্তু তার একটা সর্ত আছে। সে বলল যে তিন দিন বাঁদরের কথা ভাবা চলবেনা।  তারপর লামাজি ধ্যান সেখাবেন। লোকটা ভাবলো এ আর কি আছে,এম্নিতেই বাঁদরের কথা ভাবা হ্য়না।তাই সে রাজি হয়ে গেল।
মঠ থেকে বেরিয়েই ভাবল বাঁদর এর কথা ভাবা চলবেনা, তাইতো আবার বাঁদর। এর পর যাকিছু ভাবতে যায় বাঁদর হাজির। চারিদিকে ছড়িয়ে বাঁদর, যেদিকে তাকাই বাঁদর। তিন দিন পর সে লামাজিকে বলে আমায় ধ্যান পরে সেখাবেন আগে বাঁদর তাডান। কি যে হল আমি বাঁদর ছাড়া কিছুই মনে আসছেনা।
লামাজি বললেন বেশ এক কাজ কর, আগামী তিন দিন তুমি বাঁদর ছাড়া আর কিছুই ভাববেনা,তাহলেও হবে,তোমার ধ্যান সেখা।লোকটা ভাবল আরে বাঁদর ছাড়া কিছুই দেখতে পারছিনা,তাহলে তো এটা সুহজেই হবে,সে রাজি হয়ে গেল।
যেই না মঠের থেকে বেরিয়েছে,সব বাঁদর ভ্যানিস।চার দিকে নদী পাহাড় মানুষ জন কিন্তু বাঁদর নেই। তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও বাঁদরের দেখা পেলনা।
তিন দিন পর সে এসে লামাজি কে বলল " আমার আর ধ্যান সেখা হলনা।"
লামাজি বললেন " দেখ মন কে বশ করা একটা খ্যপা সাঁড়ের শিঙের ওপরে সরসে রাখার মত কঠিন - আর তাই করার চেষ্টা করাই ধ্যান।"




আশীষ ঘোষাল।। 

Nov 19, 2023

জল মে কুম্ভ,কুম্ভ মে জল,...

জল মে কুম্ভ, কুম্ভ মে জল, অন্দর বাহার পানি,
 টুটা কুম্ভ,জলমে জল সমায়া,
এ তত্ব কহিও জ্ঞানী। 
সন্ত কবীর। 
***
নাতিবাবু হঠাৎ একদিন প্রস্ন করে বসল "আচ্ছা দাদু মানুষ মরে গেলে কি হয়,ছবি না তারা?" কি আর বলি, বল্লুম কোনটাই নয়। "তাহলে কি হয়? বলনা,বলনা।"
বল্লুম বেশ "তবে এক কাজকর, এখন তো তোমরা বিজ্ঞান পড়ছ, একটা পরিক্ষা কর। একটা বাটিতে খানিক বরফ নাও ফ্রিজ থেকে,তারপর সেটাকে মিক্সিতে গুঁড়ো কর, করে বাটিটার ভিতর দিকে বেশ চেপে চেপে লাগাও।আর তারপর ডিপফ্রিজে রেখে দাও।" নাতিবাবু তো মহানন্দে তার মাকে বিরক্ত করতে চলে গেল। আমি একটু রেহাই পেলুম।
    কিন্তু রেহাই কি আর আছে, খানিক বাদেই নাতিবাবু হাজির,বলে "এবারে কি করব?"
এবারে বাটিটা উল্টে দিয়ে একটু ঠোকা দিলেই পেয়ে যাবে একটা বরফের বাটি। যাও করে ফেল।আর বরফের বাটিটাকে ডিপফ্রিজে রেখে দাও।
পরের দিন আবার, "এবারে কি করব?"
মহা মুশকিল, বললাম " দেখ বাটিটার অবস্থা?"
চট করে ঘুরে এসে বলে" বেশ ভাল, বরফের বাটি তৈরি হয়েছে "
বললাম "এবারে একটা গামলায় খানিকটা জল আন"
তখুনি হকুম তামিল।
"এবারে বরফের বাটিটায় অল্পজল নিয়ে গামলায় ভাসিয়ে দে।"
হুকুম তামিল।
এবারে বসে দেখ কি হয়।
নাতিবাবুর চোখের সামনে বাটিটা গলে যেতেই বাটির জল, বাটিগলা জল,আর গাম্লার জল এক হয়ে গেল।
নাতিবাবু বলে  এতো সবটাই জল হয়ে গেল।
আমি বললাম" মনেকর বাটির জলটা আমি আর বাটিটা আমার দেহ,
সময় হলেই বাটিটা গলে জলে জল মিশে যাবে।
তাহলে মানুষ মরেগেলে কি হয়?"
নাতিবাবু বলে " জলে জল মিলে যায়"
আমি বললাম " ঠিক। "
*******
পঞ্চভুত (তরল, কঠিন,বায়বিয়,শক্তি, আকাশ) = জল

Jun 15, 2023

নানাপাকাল্লা

##
মমুক্ষু মুক্তিদায়কম,
নমামি কৃষ্ণতারকম।
**
আরে আজকে হয়েছে কি রানাদা এসেছিলো আড্ডায়, হাতে একটা  লাঠি, আমরা তো অবাক,যে রানাদাকে ছোট বেলায় আমরা বুলেট নিয়ে যেতে দেখেছি,সে কিনা লাঠি হাতে। সুধোলাম " তোমার কি হল? উত্তর :
"কম্পবাত"।মানে তোরা যাকে ইংরাজিতে বলিস পারকিন্সনস। তাই লাঠি হাতে?
"ওইসব হলে কিহবে আমি তো মুক্তিনাথ ঘুরে এলাম।"
বলকি, "একেবারে নেপাল। মানেগিয়ে বিদেশ। "
নেপাল আবার বিদেশ কি, গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান, কর্মস্থান কিন্তু ভারত। বলতো গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান কোন সহরে?
এ আবার বলার কি আছে, লুম্বিনী।
যাক জানিস তাহলে।
বলনা তোমাদের মুক্তির গল্প।
বেশ তবে  শোন.…গেছিলাম আমরা সাতজন। আমরা দুজন, ক্যাপ্টেনের বাবা মা, আর আমার এক বন্ধু ভাস্কর শালীবাহন তিনজন মোট সাত।
প্রথমে একটা লজ্ঝড়ে ট্রেন মিথিলা এক্সপ্রেসে রক্সোল। ট্রেনটা যেরকম শুনেছিলাম ততটা খারপ নয়। আর আমাদের তো কোন তাড়া নেই, রোজই রবিবার, তাই এসি ২ কমপার্টমেন্টে, আড্ডাদিতে দিতে, বিকেলে ছেডে সকালেই পৌছেগেলাম রক্সোল বিফোরটাইম। আগে থেকে বলাথাকায় বিকেস একটা স্করপিয় নিয়ে রেডি ছিল। প্রবল গরম, কোনমতে লাগেজ গুলো তুলে আমরা গাড়িতে বসে গেলাম। গাড়িটায় এসি ছিল তাই বাঁচোয়া।
স্টেশন থেকে প্রথমে আমাদের নিয়ে গেল বীরগঞ্জ, ওদের আফিসে।
সেখানে আগেথেকে ঠিককরা মোট বাকি ১,১০০০০/- এর মোধ্যে ৫০০০০ ক্যাস দেওয়া হল। বাকি ৬০০০০টাকা  ফিরে দেব বললাম ব্যানক ট্রান্সফার করে। যাবার আগে  দিয়েছিলাম ৩০০০০। মোট ১৪০০০০।
এদিকে সাতজন গাড়িতে বেশ কষ্টে বসতে হচ্ছে, আমি কেঁপোলোক বলে আমাকে সবাই সামনের দিকে দিয়েছে, ২য় ও ৩য় সারিতে  বেশ  গরম হচ্ছে,অনেকেই বিরক্ত। কি আর করা,  রওনা হলাম লুম্বিনীর দিকে।খানিক এগোতেই ড্রাইভার কে আর একটা গাড়ি বলেগেল যে
ফোন ফেলে এসেছে,তাই পুন: মুষীক ভব। আবার ফিরলাম অফিসে,
সেখান থেকে ফোন নিয়ে রবার রওনা। কি রাস্তা,আহা উদয়শঙ্কর রোড বললে কম বলা হয়।হাজারগন্ডা ডাইভার্সন, নাচতে নাচতে বিকেলে  এলাম লুম্বিনী, তখন আর কারো কথা নেই।কোন মতে হোটেলে উঠে চিৎপাত।
পরেরদিন সকালে উপোস ভঙ্গের পর, মানে ব্রেকফাস্টের পর, দেখতে বেরলাম গৌতমের জন্মস্থল। এই একটা জায়গায় কেবল ব্রেকফাস্ট ফ্রী ছিল। ট্রাভেল এজেন্সি বেড এন্ড ব্রেকফাস্ট রুম বুক করেছিল।বাকি বেড অনলি। হোটেলের সাম্নেই বুদ্ধ জন্মভুমি কিন্তু অটোওয়ালা দের চক্করে সব ঘুরেদেখার আশায় আমরা দুটো আটো নিলাম ৫০০টাকা করে।গৌতম এর জন্মস্থান টি খুব সুন্দর করে সাজানো  কিন্তু বুড়ো বুড়ী দের নড়া খুলে জাবার যোগাড় হাঁটতে হাঁটতে। একটু বেলার দিকে গাড়ি চলল পোখরার দিকে। রাস্তা অর্ধেক উদয়শংকর রোড, বাকিটা হেমামালীনির গাল। পোখরা পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা, হোটেল বেশ ভাল।জানালা দিয়ে লেকের ভিউ আছে। সব হোটেলেই এসি রুম। আমিতো ঘুমিয়েই পডলাম, ওরা গেল লেক দেখতে।পরের দিন সকাল থেকে পোখরা চক্কর। বেশ কয়েকটা মন্দির,  আর গুহা দেখে আমরা দুপুরের
খাবার খেলাম,তারপর হোটেল।
পরের দিন সকাল সকাল বেরিয়ে চললাম জুমসুম,মুক্তির মন্দির পাদদেশে। রাস্তা প্রায় পুরটাই উদয়শংকর রোড, গাডির ভেতর নাচতে  নাচতে সংকির্ন কাদা-পাথুরে রোড দিয়ে সন্ধ্যার মুখে পৌছালাম জুমসুম।
এখানে ত্রাভেল এজেন্ট বলেই দিয়ে ছিল যে গ্রামীণ এলাকা, ভাল হটেল নেই তাই কাজচালাও হোটেলে বুক করেছে, বেড,ব্রেকফাস্ট, ও ডিনার সমেত। জুমসুম এসে তো চক্ষু ছানাবড়া। মোটেও গ্রাম নয়, বেশ ভাল ভাল হোটেল আছে। আমদের যে হোটেলে তুলল, তাতে মাত্র দুটো ঘর আমাদের একটা ৩ বেডের অপরটা ৪বেড।ঘরের মাঝখানে ফাঁকায় বসে লোকে ড্রিনক করছে। মালকিকন কে বলতেই বলে "চলেযাও অন্য হোটেল দেখে। "অগত্যা আমরা উল্টোদিকের একটা হোটেলে উঠলাম। ট্রেকারস ইন। দু রাতের জন্য ২৪০০ টাকা নেপালী। খাওয়া আলাদা। এই সব করতে করতে  এলো বৃষ্টি, অগত্যা ঘরেই বন্দী। কে জানত যে সেটাই শাপে বর। পরের দিন মুক্তি নাথ রওনা হতে হবে।প্রথম ২৫ কি মি গাড়ীতে তার পর এগার নম্বর, মানে হেঁটে। সকালে উঠেই দেখি মেঘমুক্ত আকাশ আর আর চোখজুড়ানো তুষার কিরিট নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনায় দাঁড়িয়ে হিমালয়। মন বলে উঠল " এ কাঁহা আগয়ে হম... …"
আর বিলম্ব না না, আর বিলঅম্ব নয়,আর বিলম্ব নয় এখন ধকল সয় - এবার চলো মুক্তিনাথ।

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন পথ ঠিক পথে  চলি। আটটা বাজতে নাবাজতেই আমরা গাড়িতে উঠে বসি।এখানে ঠান্ডা, এ সি দরকার নেই। জয় বাবা মুক্তিনাথ, নারায়ণ। খানিক যাবার পরেই গাড়ি থামাতে বললাম, ছবি তুলব কিন্তু ভিকেস( ড্রাইভার) রাজি নয় কারন গাড়ি চড়াই উঠছে। কিন্তু হোই সোই যো রাম রচিরাখা। গাড়ি রাস্তা ছেড়ে একটু যেই নুড়িতল (মানে নুড়িবিছান সমতল) পেয়েছে ওমনি দাঁড়িয়ে গেল। কেন, না ইঞ্জিন ঠান্ডা করতে পারে। আমরাও মওকা পেয়ে গেলাম ছবি তোলার।
ফোটো সেসন শেষ করতেই আবার চলা,এবার গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল মুক্তির মন্দির সোপান তলে। ১৩০ টা ধাপ+ ১০টা মন্দিরের,অনেকটাই হ্যান্ডেল দেওয়া, নহলে আমার মত কম্পবাতের রুগীর যেতে হতনা।
কদিন আগেই উচাই দেখেছি,তাই এক কদম এক সাঁশ, করতে করতে পৌঁছে গেলাম মুক্তি নাথএর দুয়ারে।বিগ্রহের ছবি তোলা মানা, আর শুধু আমাদের জন্যই নয়,কোথাও কোন ছবি কিনতেও পাওয়া যায় না। চত্তরে ছবি তুলেই সন্তুষ্ট থাকতে হল।খুব ভাল দর্শন হল। মন্দিরের তিনদিক ঘুরে ১০৮ জলের ধারা আসছে ১০৮ গোমুখাকৃতি পাথরথেকে। সেই ১০৮ ধারায় চান ধরলেই ডবল পুন্নি মানে মুক্তি, মানে নির্বান মানে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি।আর কেউ মুমুক্ষু না পাওয়াযাওয়ায় আমিই ভাবলাম করেই ফেলি চান।আরকিছু হোক না হোক ওই ঠান্ডাজলে চান করলেই খালিগায়ে চান করলেই পেস্মেকারে চলা হৃদয় নিশ্চয় মুক্তি পাবে।অথয়েব জামাকাপড় খুলে বেশকরে সরসেরতেল মেখে ১০৮ ধারায় দৌড়।বৌ ভাবল বিধবা হবে কিন্তু বিধি বাম, চান করে বেশ ভালই লাগল। জামাকাপড় পরে পেস্মেকার সমেৎ বেঁচে ফিরলাম। সবাই মিলে মন্দিরের সামনে ছবি  তুলে আমরা রওনা হলাম নিচের দিকে। অনেকেই ঘন্টা ঝাড়ল,মানে বেওয়ারিশ ঘন্টা নিল ( আমিও)।আধঘন্টায় সিঁড়ির নিচে। আরো আধঘন্টা লাগল গাড়ির কাছে যেতে। চলল স্করপিও গাড়ি, জুমসুমেরি পাড়ি, সব পাহাড়কে ওপরে রেখে হোটেল পৌঁছে গেলাম। আজকের মত এখানেই ইতি।বাকি গল্প পরে হবে। এইনা বলে রানাদা
উঠে পড়ল।দেখলাম তিনটে সিগারেট আর এক ভাঁড় চা বিল হয়েছে, ভালাম সস্তাই হয়েছে।
।।আশীষ ঘোষাল।।
****

 





May 19, 2023

।।নানাপাকাল্লা।।

নানা পাকাল্লা।

সেদিন পোলে( মানে আড্ডায়) হঠৎ রানাদা হাজির। আড়ালে আবডালে আমরা যকে নানাপাকাল্লা বলে থাকি। তখন আড্ডায় কথা হছিল আজকালকার ছলেপুলেদের শোয়াওঠা নিয়ে। রাত তিনটেতে শুতে যাওয়া দুপুর দুটোয় ব্রেকফাস্ট কিম্বা ব্রাঞ্চ। আড়াইটেতে খেলতে গেল,চানকরল সাড়ে চারটেয়।....ইত্যাদি ইত্যাদি। 
মন দিয়ে শুনছিল রানাদা ওরা থামতই বলে উটল, আরে আয়ার পাসের ফ্ল্যাটে কাল দুটোর সময় হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের গান বেজে উঠল।আমরা খাবার টেবিলে, বৌ একটু মুচকি হেঁসে,বলল আজ পঁচিশে বৈশাখ তো তাই ভোর হতেই রবিঠাকুর।
আমি বলি আরে মুর্খ, গীতা পড়েছ? ওরা পড়েছে, 
যা নীশা সর্বভুতানাম তশ্যাং জাগ্রতী সংজমী,
জস্যাং জাগ্রতী সর্বভুতানাম, সা নিশা পস্যতে মুনে। 
মানে কিছু বোঝা গেল?
অর্থৎ যখন ঘুমায় সারা জগৎ তখন জাগেন জ্ঞ্যাণী,
আর যখন ঘুমান জ্ঞানী,  জাগে সারা সকল অজ্ঞাণী।
আমরা তো হতবাক, মানে কি দাঁড়াল? আমরা সব বুদ্ধু আর ওরাই ঠিক।
******আবার পরে হবে****অনেক কথা আছে*****
আশীষ ঘোষাল।

Aug 10, 2022

-ঃশুন্যঃ-২

পরেরদিন আমার আর আমার দার্শনিক বন্ধুর চা এর আসরে হাজির নাতিবাবু।বলল দাদু তুমি কাল যে বললে ট্রেনটা এগোতে থাকলে বাকি পথটা যখন যত ছোট আমরা ভাবতে বা মাপতে পারি তত ছোট হবে তখন ট্রেন এগোলে আর কিছু বাকি থাকবে না,ট্রন স্টেশনে পৌঁছে যাবে। কিন্তু কত ছোট আমরা মাপতে বা ভাবতে / হতে পারে?
আমি বললাম সাবচেয়ে ছোট দৈর্ঘ যা আমরা মাপতে পারি তা হল ৫০ পিকো মিটার মানে ৫×১০^-১১মিটার।আর সবচেয়ে ছোট দৈর্ঘ যা সম্ভব তা হল প্ল্যানক দৈর্ঘ যেটা হল ১.৬×১০^-৩৫.
ও আচ্ছা, বলে সে চলে গেল।
বন্ধু বলে বসল " আচ্ছা এখানে তাহলে শুন্য হচ্ছে ধনাত্মক ও ঋনাত্মক দিকে যত ছোট হতেপারে সেই দুরত্বের মাঝের বিন্দু? "
"ঠিক। কিন্তু এখানেই এসেগেল ইন্দ্রিয়ের নির্ভরতা। কারন দৈর্ঘ বা দুরত্ব মানেই দুটি বিন্দুর মধ্যে অবস্থানের পার্থক্য। এ সবই সাপেক্ষ সত্য, নিরপেক্ষ সত্যে দুই বা দিত্ব নেই তাই দুরত্বও নেই,আদি বা অন্তও নেই। পরিবর্তন নেই তাই সময় নেই, সুর্য,চন্দ্র,বাতাস আলো কিচ্ছু নেই।"
"ধুত্তেরি কেবল না আর না, কি আছে বলনা?"
"ওই খানেই তো মুস্কিল,  আমরা তো সাপেক্ষ জগতে আলোচনা করছি,এখানকার ভাষায়।
এই ভাষা তো সাপেক্ষ ভাষা, কিকরে এই ভাষা নিরপেক্ষকে বর্ননা করবে? তাই হয় বলছে সেখানে কি কি নেই,বা তা কি কি নয়। আর যেই তার বিশেষত্ব বলতে যাচ্ছে, ভুল হয়ে যাচ্ছে, মানে যদি বলে তিনি চিরকালের, ওমনি পন্ডিতেরা বলবেন যেকানে কাল নেই, সেখানে চিরকালের? তাই তর্ক মেনে কেউ বলেছে শুন্য,  আর তর্কসাপেক্ষে ভুল জেনেও সাপেক্ষ জগতের ভাষায় কেউ বলেছেন।
তিনি সচ্চিদানন্দ স্বরুপ। "
এমন সময় আবার এসে হাজির নাতিবাবু " দাদু, আমি কো-অর্ডিনেট জিওমেট্রি পড়ছি। তুমি বল তিনটি অক্ষের সংযোগস্থলটি হচ্ছে শুন্য। মানে এই ঘরের উত্তর এবং পুর্ব দেওয়াল  আর মেঝে কে যদি অক্ষতল বলি,তাহলে উত্তর আর পুর্ব দেওয়াল যে রেখায় মিলেছে তার মেঝের উপরের বিন্দুকে শুন্য ধরলে পাখাটার অবস্থান নিশ্চয় করে বলা যায়( ৫,৫,৮) ফুট। তাহলে( ০,০,০) কে কিছু নেই বলা যাবেনা কেন?"

তোর ঘরের কোনাটা বাড়ির উত্তরদিকের দেয়াল থেকে,পুবদিকের দেওয়াল থেকে আর প্লিন্থলেভেল থেকে কত দূর?
সেতো (১০,১০,১০) ফুট।
তাহলে তোর শুন্যবিন্দু বাড়ির উত্তর, পুর্ব দেওয়াল আর প্লিন্থ লেভেলকে অক্ষতল বললে (১০,১০,১০)এ অবস্থিত। মানে তোরকাছে যা শুন্য অন্য অক্ষতলেএর হসেবে তার মান শুন্য নয়।
ও তাই, বলে নাতিবাবু বিদায় নিল।
আর আমি বন্ধুকে বললাম।
তাই 
শুন্য শুধু শুন্য নয় জানিবে নিশ্চয়।
'শুন্য' আর 'পুর্ন ' "ব্রহ্মে"একাকার হয়।
।।আশীষ ঘোষাল।।