Mar 17, 2025

আজব চশমা।

আজ আমার শেষ বারের কুম্ভ মেলা ভ্রমনের আর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলি।আমি আজ পর্যন্ত তিনবার কুম্ভমেলায় গেছি,তিন বারই এলাহাবাদে।প্রথম দুবার পুর্ণকুম্ভ আর তিনবারেরবার অর্ধকুম্ভ।প্রথম বার গিয়েছিলাম আমি সস্ত্রীক,  ছোট কাকা, কাকীমা। সেবার কোন থাকার যায়গা ঠিক না করেই। কপালগুণে গৌড়ীয় মঠে একটা ঘর মিলে গেল।আমরা গিয়েছিলাম একটা শাহী স্নানের আগের দিন।ঘরে ঢুকেই খবর নিতে লাগলাম পরের দিন স্নান কখন আর কি করে যাব। খবর শুনে বৌ আর কাকীমার মাথায় হাত।স্নান রাত প্রায় আড়াইতেতে বেরুতে হবে,স্নান তিনটে পনেরোয়। সামনেই ভারতসেবাশ্রম, ওখানেই
রাত দুটো নাগাদ লোকে জড় হবে, আড়াইটের সময় মহারাজের সাথে সঙ্গমে স্নানের জন্য রওনা হবে। শুনে গিন্নি ও কাকীমা বলল, " মাথায় থাক পুন্য, আমরা বাবা যাবনা" অতয়েব শীতের রাতে দুটোর সময় আমি আর ছোট কাকা গেলাম চান করতে। ফিরলাম ভোর হতে। সেদিনটা মেলা দেখে রাতে ট্রেন ধরলাম।
বার বছর পর পরের কুম্ভ মেলায় গিয়েছিলাম আমি আর ছোট কাকা। ছিলাম দ্বিবেদিজির কল্পবাসী বাবা মায়ের সাথে পাসের তাঁবুতে। দ্বিবেদিজি,  পন্ডিত ফ্যামিলির লোক, ওনারা প্রতিবছর গোটা মাস সঙ্গমে সাত্বিক স্বপাক ভোজন করেন, স্নান করেন,সঙ্গমে তাঁবুতে বাস করেন। আমরা দ্বিবেদিজর কৃপায় ওনার বাবামার পাসে একটা তাঁবু পেয়েছলাম, দিন দশেক ছিলাম।
গিয়েই ব্যাগ রেখে গেলাম সঙ্গমে চান করতে গেলাম  জামা কাপড় রেখে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ছোট কাকা চানকরে এলো আমি গেলাম চান করতে,ছোট কাকা প্যান্ট পরতে গিয়ে দেখে নেই।পকেটে ছিল টাকাপয়সা,মোবাইল সব। ছোট কাকা তো বলে ফিরে যাব,যাইহোক কোনো রকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে থাকতে রাজি করালাম।তারপর বেশকিছুদিন তাঁবু তে ছিলাম রোজ স্নান করলাম।
তার পর ফিরে এলাম।
  
তারপর আরো ছয় বছর পরে এলাহাবাদে অর্ধকুম্ভ। ইতিমদ্ধে  দ্বিবেদিজির মহাগুরুনিপাত হয়েছে। ওনাদের আর কেউ কল্পবাস করেনা।তবু দ্বিবেদিজি একটা ব্যাবস্থা করে দিলেন। এবার গেলাম আমি আর ভাস্কর। ভাস্কর আগে কুম্ভ মেলায় যায়নি। এবার তাঁবুটা সঙ্গম থেকে অনেক দূরে, ব্রিজের তলা দিয়ে বেশ খানিক গিয়ে। এবারের কুম্ভমেলা অনেক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এবার দিন সাতেক থাকব বলে গিয়েছিলাম।সাহীস্নানের দুদিন আগে গেছি আর পরে দুই দিন।আসা যাওয়া নিয়ে দিন সাতেক। প্রথম দিন অনেকটা হেঁটে স্নান করে এলাম। সন্ধ্যায় বিভিন্ন আখাড়ায় ঘুরে ঘুরে সৎসঙ্গ। সাহী স্নান সকাল ছটার মধ্যে। সঙ্গমে যেতে ঘন্টা খানেক তো লাগবেই। সাড়েপাঁচটায় স্নান করতে হলে সাড়েচারটেতে বেরতে হবে। মোবাইলে চারটেতে য়্যলার্ম দিয়ে শুলাম। মাটিতে খড় বিছান তার ওপরে তেরপল দেওয়া। তার ওপরে স্লিপিংব্যাগে আমরা। ভোর হতে আমরা রওয়ানা দিলাম। সঙ্গমে পৌছে ভালোকরে সরষের তেল মেখে আমি গেলাম চান করতে,  চশমা আর বাকি সব ভাস্করের কাছে রইল।
চান করতে নামব, চশমা নেই,তাই দুরের কিছু ঠিক মত দেখতে পাচ্ছিনা।পাসেই একজন দেহাতি টাইপের লোক দাঁড়িয়ে। পরনে খেঁটে ধুতি, ফর্সা চেহারা,লম্বা লম্বা চুল,বছর পঁইতিরিসবয়স, মুখটা একটু মেয়েলি, আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে,  কি রকম অস্বস্তি লাগতে লাগল।
"ক্য হুয়া, সাচ ঠিক ঠাহর নেহি হো রহা হ্যায়"
"হাঁ, চশমা নেহি হ্যায় না, ইস লিয়ে"
"এক কাম কিজিয়ে, ইয়ে চশমা পহন লিজিয়ে, সব ঠিক ঠিক দিখাই দেগা। ফিকর মাত কর,ইয়ে চশমা নস্ট নেহি হোগা।"
এই না বলে সে আমাকে একটা কাল চশমা,  অনেকটা ছানি অপারেশনের পরে যেরকম দেয়, দুম করে পরিয়ে দিল। ব্যাস কোথায় সঙ্গম,কোথায় এলাহাবাদ, কোথায় ভিড় সব মিলিয়ে গেল,দেখলাম মা,বাবা,দাদু,কাকারা,মাসী,মেশো যারা এই জগতে নেই তারা আর যারা বেঁচে তারাও সবাই আগে পরে একটা বিরাট কাল গর্তের দিকে ধাবমান, ক্রমশ তারা মিলিয়ে গেল, প্রিথিবী, চন্দ্র,গ্রহ তারা সেই গর্তের দিকে এগোতে লাগল, ক্রমশ গরুর গাড়ির চাকার মত আমাদের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি গর্তে মিলিয়ে গেল এর পর ক্রমশ একের পর এক গ্যেলাক্সি মিলিয়ে যেতে লাগল। চারপাশে তাকাতে চোখ ঝলসে গেল। যেন সত সুর্যের আলো। তার মধ্যে কত রকমের প্রানী, যাদের কখনো চোখে দেখিনি,এমনকি ডিস্কভারিতেও নয়। ইতি মধ্যে সব সমেত কাল গর্তের কাছে এসে গেছি, ভয় করতে লাগল।ফিরতে পারব তো? গর্তের মধ্যে যেই না ঢুকে গেছি, দেখি আলাদা কিছু নেই, আগুনের গোলার মত ঘুরছে, আর নতুন জগৎ জন্ম নিচ্ছে,আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠে চোখ থেকে কাল চশমাটা টেনে খুলে সামনে সঙ্গমের জলে ফেলে দিলাম। দেখি পাসে সেই দেহাতি লোকটা মিটি মিটি হাঁসছে, বলল "ক্যা হুয়া সাচ সহা নেহি গয়া? অত্রি গুহামে নিরপেক্ষ সাচ ভি নেহি ঔর ইধর সাপেক্ষ সাচ ভি নেহি?"
ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং, ক্রিং....... এলার্ম বাজছে, ভাস্কর ডাকছে, কি হল! ওঠ শাহী স্নান করবি না?
য়্যঁ,.....  ও হ্যাঁ  ঠকই তো....  আমি উঠে পড়ি।গামছা, তেল সবই তো গোছান  আছে, চল, বলে আমরা বেরিয়ে পোড়ি।