তারে ধরি ধরি মনে করিঃ-
*******
সেদিন সকালে চন্দন ফোন করেছে " আরে তোকে সেদিন একটা রচনা পড়িয়ে ছিলাম না,৷ তুই বলেছিলি ইন্টারেস্টিং, সেই পাগলা ছেলেটা এবার ক্লাসটেস্টে একটা ব্যাখ্যা লিখেছে।একদিন পড়াব" শুনে থেকে ভাবছি যাব যাব কিন্তু যাওয়া আর হয় না। গতকাল ছুটির দিন সকাল বেলাই হাঁটতে বেরিয়ে চলে গেলাম। জনান্তিকে বলে রাখি, আমার জানাই ছিল যে রবিবার সকালের জলখাবারটা চন্দনের বাড়ি লুচি তরকারিই হয়ে থাকে। বাইরের ঘরে চন্দন বসে খবরের কাগজ পড়ছিল, আমাকে দেখেই হাঁক দিল " বৌমা দুকাপ চা" আমি বললাম "তোর দুকাপ চা বলায় মনে পড়ে গেল, বল দেখি একদিন শ্যামবাজার পাঁচমাথা থেকে সন্ধ্যা বেলায় হাতিবাগানের দিকে যাচ্ছি দেখি একটা বাড়ির মাথায় নিয়ন সাইনে লেখা ' তের কাপ নুন', বল দেখি আসলে ওটা কিসের বিজ্ঞাপন?
ব্যাটা তুই মাস্টারের পরিক্ষা নিচ্ছিস? আমি জানি কারন আমি দিনের বেলায় ওটা দেখেছি। ওটা হল "তাঁতের কাপড় কিনুন"। ভাল বলেছিস তো, তার মানে অজ্ঞানের সন্ধ্যাকালে নিয়ন সাইনে যেটা 'তের কাপ নুন' দিনের আলোয় বা জ্ঞাণের আলোয় সেটা 'তাঁতের কাপড় কিনুন'। "আরে তোর কি ওই পাগলা ছেলেটার ছোঁয়া লাগল? সবেতেই একটা অদ্ভুত মানে বার করছিস।" এই বলে একটা খাতা বেরকরল বলল পড়, "আমি ক্লাসে মজাকরে ক্লাসটেস্টে একটা সবচিন বাউল গানের লাইন দিয়েছিলাম ব্যাখ্যা লিখতে। লাইন টা ছিল 'তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে আর পারিনা।' প্রথমে বললাম প্রথমে পুরো গানটা একবার পড়ে তারপর লেখ। এই না বলে একটা প্রিন্ট আউটের কয়েকটা জেরক্স দিয়ে দিলাম।
এই বলে আমাকেও একটা জেরক্স কপি দিল।আমি পড়লাম,
*******
তারে ধরি ধরি মনে করি
ধরতে গেলেম আর পেলাম না। - ২
দেখেছি,
দেখেছি রূপসাগরে
মনের মানুষ কাঁচা সোনা। -২
বহু দিন ভাব তরঙ্গে
ভেসেছি কতই রঙ্গে, -২
সুজনের সঙ্গে হবে দেখা শুনা।
তারে আমার আমার মনে করি,
আমার হয়ে আর হইলো না
আমার আমার মনে করি,
আমার হয়ে আর হইলো না
দেখেছি,
দেখেছি রূপসাগরে
মনের মানুষ কাঁচা সোনা। -২
সে মানুষ চেয়ে চেয়ে
ফিরিতেছি পাগল হয়ে, - ২
মরমে জ্বলছে আগুন আর নেভে না।
আমায় বলে বলুক লোকে মন্দ,
বিরহে তার প্রাণ বাঁচে না
বলে বলুক লোকে মন্দ,
বিরহে তার প্রাণ বাঁচে না
দেখেছি,
দেখেছি রূপসাগরে
মনের মানুষ কাঁচা সোনা। -২
পথিক কয় ভেবো নারে
ডুবে যাও রূপসাগরে, -২
বিরলে বসে করো যোগ-সাধনা।
একবার ধরতে পেলে মনের মানুষ,
ছেড়ে যেতে আর দিও না
ধরতে পেলে মনের মানুষ,
ছেড়ে যেতে আর দিও না
দেখেছি,
দেখেছি রূপসাগরে
মনের মানুষ কাঁচা সোনা।- ২
তারে ধরি ধরি মনে করি
ধরতে গেলেম আর পেলেম না
ধরি ধরি মনে করি
ধরতে গেলেম আর পেলেম না
দেখেছি,
দেখেছি রূপসাগরে
মনের মানুষ কাঁচা সোনা। -২
*********
"বাকিরা তো ভয়ানক ব্যাখা লিখল, মনের মানুষ মানে যাকে মনে ধরেছে, এই না বলে এমন ব্যাখ্যা লিখল, সে আর বলে কাজ নেই।
পাগলা কি লিখল তাই পড়, " এই না বলে খাতা ধরিয়ে দিল। আমি পড়তে লাগলাম।
######
এই গানটা বাউল অঙ্গের গান, আর বাউল রা যা লেখে বা গায় তার একটা অন্তুর্নিহিত অর্থ থাকে।এখানে 'রুপসাগর' আর 'মনের মানুষ' এই দুটো কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে হবে।
আমরা এই জগতে যা কিছু দেখি, জানি বা যা দিয়ে জগৎ তৈরি, সে সবকিছুরই একটা রুপ বা চেহারা আছে আর আছে একটা নাম। যেমন আমি,আমার একটা চেহারা আছে,বা রুপ আছে,আর আছে একটা নাম। সেই রকম এই টেবিলটার ও একটা চারপাইয়া চেহারা আছে, আর আছে একটা নাম 'টেবিল'। আরো একটা আছে যাকে বলাযায় 'ব্যাবহার' যেটার এই ব্যাখ্যায় দরকার নেই। এই জগৎ যদি সমুদ্র বা সাগর মনে করি তাহলে সে নাম-রুপ জগৎ হল 'রুপসাগর'।
এবার দেখা যাক 'মনের মানুষ ' কাকে মনে করা হয়েছে। বাউল এই রুপসাগরে একটা স্বত্তার উপস্থিথিতি অনুভব করেছেন, যা সবকিছুর মধ্যেই আছে বা যার মধ্যে সব কিছুই আছে,কিন্তু সে সত্তাকে ঠিক মত অনুভব করতে পারছেন না, কেবল মনের বা ধ্যানের গভীরে কিছু অনুভব করছেন,সেই ভাবে আশা করেছেন সেই সুজনের সংগে দেখা হবে। যেমন বিভিন্ন গয়নার বিভিন্ন নাম আছে, বালা,আংটি, হার আর আছে বিভিন্ন রুপ কিন্তু সব কটারই উপাদান কাঁচা সোনা। ঠিক সেই রকম এই নাম রুপ জগতের উপাদান 'মনের মানুষ ',যাকে চেষ্টা করেও বাউল কবি অনুভব করতে পারছেন না। তিনি বলছেন তাঁকে পাবার ইচ্ছায় জ্বলে মরে যাচ্ছেন, সেই অনুভবের বিরহে বা অভাবে তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন, লোকে তাকে মন্দ বলছে কিন্তু তাতে কিছু আসে যায়না।
সেই অনুভবের পথিক, মানে সেই পথে যে গিয়েছে সে বলছে, চেষ্টা করে যাও,রুপ সাগরে ডুব দাও, সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে চেষ্টা কর, আর একবার সেই মনের মানুষকে পেলে আর ছেড়ে দিওনা।
কিন্তু বাউল বলে কই সে মনের মানুষ, তাকে মাঝে মাঝে ধরে ফেলেছি মনে হয় কিন্তু ধরে রাখা যায়না।
ঠিক এই কথাটাই রবি বাউল লিখেছেনঃ-
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা।
কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে তোমাকে দেখিতে দেয়না।
********
পড়ে আমি বললাম " এছেলে তো মারত্মক, কিছু না কিছু অদ্ভুত বলবেই, সবকিছুকেই সেই গরুর রচনা লেখার গল্পের মত একই যায়গায় এনে ফেলবে। তুই ওকে জিজ্ঞেস করিস তো রবিঠাকুরের হিং টং ছট কবিতায় গৌড়িয় কবি হিং টিং ছট এর যে ব্যাখ্যা দিয়ে ছিল " ত্রম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুন.... ইত্যাদি -- এর কোন মানে আছেকি? নাকি কেবল হিং টিং ছট।
No comments:
Post a Comment