Jul 28, 2022

।।জলের আত্মজীবনী।।

।।জলের আত্মজীবনী।। 
******
আমার এক বন্ধু চন্দন ইস্কুলে বাঙলা পডায়। একদিন ওদের বাড়ি গেছি, দেখি খাতা দেখছে।আমি গিয়ে বসতে ওর বৌমা চা বিস্কুট দিয়ে গেল। 
বলেগেল আগে চা টা খান, তারপর লুচি আর সাদা আলুর চচ্চড়ি হচ্ছে আপনাকে আর বাবাকে দিয়ে যাব। বাবার চা খাওয়া হয়ে গেছে।
বৌমা চলে যেতে, চন্দন বান্ডিলের বাইরে রাখা একটা খাতা নিয়ে আমার হাতে দিল। বলল আমাদের ঈস্কুলে একটা ছেলে আছে, একটু পাগলা গোছের কিন্তু একদম অন্যরকম ভাবতে পারে, লেখেও ভাল, কিন্তু ভয়ানক বানান ভুল লেখে। এবার পরিক্ষায় রচনা দিয়েছিলাম "জলের আত্মজীবনী", কি লিখেছে দেখ, বানান দেখিস না কারন আমি জানি বানানে তুইও ওই ছেলেটারই মত। বিষয় হিসাবে তুই দশে কত দিবি?
আমি খাতা খুলে পড়তে সুরু করলাম।
*****
আমি জল, আমার অপর নাম জীবন। আমার কোন রং নেই, গন্ধ নেই, স্বাদ নেই, আকার নেই,মানে যে পাত্রে থাকি আমার আকারও তার মতই হয়। আমি কখনও বরফ, কখনও বাস্প, কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি,কখনও নদী  কখনও সমুদ্র,  কখনও ঝিল কখনও পুকুর কখনও ঢেউ কখনও ঘুর্ণি, আমি যত জীব আছে তার  একটা প্রধান অংশ।  সব মানুষের প্রায় সত্তর ভাগ আমি।
এই পৃথিবীতে  আমার জন্ম প্রায় পৃথিবীরই সাথে। যখন সুর্য থেকে একটা অংশ ছিটকে এসে টুকরো  টুকরো  হয়ে সুর্যকে প্রদক্ষিণ করতে লাগল, তখন সুর্যের দিক থেকে তৃতীয় টুকরো টা, যেটা আজকের পৃথিবী, ক্রমে ঠান্ডা হতে থাকল। তখন আমি ছিলাম আমার দুই মৌলিক উপাদান হাইড্রোজেন  আর অক্সিজেন হিসেবে। পৃথিবী খানিক ঠান্ডা হতেই হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিলে তৈরি হলাম আমি। তখন পৃথিবী খুব গরম তাই আমি ছিলাম বাস্প হয়ে পৃথিবীর চারপাস ঘিরে। আস্তে আস্তে পৃথিবী নামের গরম তরলের গোলা ঠান্ডা হতে থাকল,  তরল গোলার ওপোর জমে যাওয়া তরলের সরের মত আস্তরন পড়তে লাগল। ক্রমে আস্তরন মোটা হতে থাকল,  আর সেই মোটা আস্তরনের ভিতর টা ঠান্ডা হওয়ার হার কমতে লাগল, আর আস্তরনের ওপরটা ঠান্ডা হতে লাগল তাড়াতাড়ি কিন্তু ভিতর টা গরম , এই ঠান্ডা গরমের ফলে আস্তরন টা কুঁচকে যেতে থাকল,  কোথাও খুব উঁচু কোথাও খুব নিচু কোথাওবা সমতল। ইতিমধ্যে গরম কমায় আমার অনু গুলোর ছোটাছুটি কমল আর অনেকে মিলে তৈরি করল ছোট ছোটো কনা আর কনাগুলো পাশাপাশি হয়ে তৈরি করল মেঘ।  আর একটু ঠান্ডা হতেই সুরু হল বৃষ্টি,  আমি পৃথিবীর পিঠে সব নিচু যায়গা ভরে দিয়ে তৈরি কোরলাম সমুদ্রে আর হ্রদ। খুব উঁচু হওয়া যায়গা হল পাহাড়। পাহাড়ের ওপর পড়ে জমে গিয়ে আমি বরফ হলাম। আর সুর্যের আলোয় গলে গলে যেখানে নিচু পেলাম সেখান দিয়েই বইতে লাগলাম, হয়ে গেলাম নদী। বইতে বইতে নদী সমুদ্রে এসে পড়ে। সমুদ্র হোক বা নদী,  বাস্প হোক বা বরফ, আসলে আমি জল - কিকরে আমার এই জ্ঞান হল সেই গল্প বলি।
একবার সমুদ্রে এক বিরাট ঢেউ উঠল, আমি ভাবলাম আমি ওই ঢেউ, আসে পাসে অনেক  ছোট মেজ ঢেউ ছিল তাদের সাথে চলতে থাকলাম। কারুর সাথে বন্ধুত্ত হল, কারুর সাথে শত্রুতা, মনে হল আমি কত বড়, কেউ আমাকে ভালবাসল কেউ বড় বলে হিংসা করল। এই রকম করে চলছিল, হঠাৎ একসময় দেখলাম সাগরের পাড় আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে, মনে হল আর কিছু বাদেই তো আমি আর আমার সাথে ছোট বড় সব ঢেউই মাটিতে আছড়ে পড়বে আর সব ঢেউ, ঢেউ থাকবেনা।খুব ভয় করতে লাগলো, দুঃখ হল, কিন্তু যা ভাবছিলাম তাই হল, সবাই মাটিতে আছড়ে পড়ে আর আলাদা আলাদা ঢেউ থাকলাম না সবাই জল হয়ে সমুদ্রে মিশে গেলাম, তখন চৈতন্য হল আমি আসলে জল, কোন ঢেউ নয়। তার পর অনেক বার ঘুরেছি,  কখনও বাস্প হয়ে মেঘ হয়েছি, বৃষ্টি, হয়েছি, বরফ হয়েছি,  গলে নদী হয়ে বয়ে গেছি সাগরে। নাম যাই হোক আমি আসলে জল তাই এখন আর নিজেকে ঢেউ,  নদী, বাস্প বা বরফ ভাবিনা,  আর চেহারা বদলে যাবে জেনে ভয় বা দুঃখও পাইনা।
*********
এই রকমই জলের আত্মজীবনী। 
*********
পড়ে আমি ভাবলাম এ তো বেদান্তের কথা। যদি ঢেউ, বা নদী কে জিবাত্মা ভাবি, সমুদ্র কে ইশ্বর, তাহলে জল হল সৎচ্চীদানন্দ ব্রহ্ম।
********
আমিতো এই রচনায় কোন নম্বর দিতে পারিনি, আপনি দশে কত দেবেন?
########
।।আশীষ ঘোষাল।।

No comments:

Post a Comment